
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সরে আসতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বীকৃতি—এবং বাজারের দরপতনকে “খুবই প্রয়োজনীয় সংশোধন” বলে উড়িয়ে দেওয়া—বাজারে আরও হতাশাবাদের আশঙ্কায় বিক্রেতাদের সতর্ক রাখছে। উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, 9 এপ্রিল নির্ধারিত শুল্ক কার্যকরের আগে প্রায় 50টি দেশ শুল্ক নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে ট্রেডাররা শুক্রবারের ইতিবাচক মার্কিন Nonfarm Payrolls (NFP)-কে মোটের ওপর উপেক্ষা করেছেন। এর ফলে US Dollar Index (DXY) সাময়িকভাবে কয়েক মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে স্থিতিশীল হয়েছিল। ফেড চেয়ার জেরোম পাওয়েলের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকেও ডলারের দুর্বলতা এসেছে। তিনি বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন; এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও চীনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে, US futures-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর মতো নিরাপদ আশ্রয়ের মুদ্রার দর বেড়েছে। অন্যদিকে, চীনের চাহিদা-সংক্রান্ত খবর ও টেকনিক্যাল সাপোর্টে সোনার দাম ঘুরে দাঁড়ালেও মার্কিন ডলার দুর্বল রয়েছে। EURUSD ও GBPUSD স্থিতিশীল থাকলেও চীন নিয়ে উদ্বেগ ও সুদ কমানোর আশঙ্কায় AUDUSD এবং NZDUSD চাপে রয়েছে। তেলের দাম 4 বছরের সর্বনিম্নে নামায় USDCAD-এ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এদিকে, মাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলো চাপে রয়েছে এবং ক্রিপ্টো নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান সম্পর্কে আশাবাদ কমছে।
দুর্বল মার্কিন ডলারের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা কমার আশায় ইউরো (EUR) ও পাউন্ড (GBP) কিছুটা বেড়েছে এবং শুক্রবার 6 মাসের সর্বোচ্চ থেকে হওয়া দরপতন পুষিয়ে নিয়েছে। বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু শুল্ক প্রত্যাহার করতে পারে। তবে অর্থনীতিতে এর প্রভাব এবং ফেডের সম্ভাব্য সুদের হার কমানো নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। এদিকে, গরুর মাংস ও মাছের ওপর যুক্তরাজ্যের শুল্ক কমানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ বেড়েছে। তবে EU ও ECB কর্মকর্তারা বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
ব্যাপক ঝুঁকি-বিমুখতার কারণে ট্রেডাররা প্রচলিত নিরাপদ আশ্রয়স্থল জাপানি ইয়েনের (JPY) দিকে ঝুঁকছেন। এতে USDJPY-তে সামান্য পতন হয়েছে এবং শুক্রবার ছয় মাসের সর্বনিম্ন থেকে হওয়া সংশোধনমূলক উত্থান মুছে গেছে। জাপানের হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ, মিশ্র অর্থনৈতিক তথ্য এবং জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করা BoJ-এর কড়া নীতির সম্ভাবনাও ইয়েনকে শক্তিশালী করতে পারে। তা সত্ত্বেও, জাপানে প্রকৃত মজুরি টানা দ্বিতীয় মাসে কমায় USDJPY জোড়ার দামের পতন সীমিত হয়েছে।
ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা, চীনের পাল্টা শুল্ক এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নরম নীতির ইঙ্গিতে AUDUSD ও NZDUSD যথাক্রমে 5 বছর ও 2 মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। চীনের প্রণোদনার ইঙ্গিত এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য আলোচনা লোকসান সীমিত করতে সহায়তা করছে। এদিকে, 4 মাসের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরও USDCAD সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তেলের দরপতন, যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং BoC-এর নরম অবস্থান এর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সোমবার সোনার দাম ঘুরে দাঁড়ায়। দুর্বল US Dollar, চীনের টানা পাঁচ মাসের কেনাকাটা এবং ঊর্ধ্বমুখী চ্যানেল থেকে পাওয়া টেকনিক্যাল সাপোর্ট দামকে সহায়তা করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চাহিদা কমার আশঙ্কা এবং OPEC+ সরবরাহ বাড়ার উদ্বেগে WTI ক্রুড অয়েলের দাম 2021 সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। গত সপ্তাহে দাম 12%-এর বেশি কমেছিল।



বিটকয়েন টানা তৃতীয় দিনের মতো কমে নভেম্বর 2024-এর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর ইথেরিয়াম নেমেছে 25 মাসের সর্বনিম্নে। শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা এবং দুর্বল অন-চেইন মেট্রিকস থেকে সৃষ্ট লিকুইডেশনের কারণে বৃহত্তর বাজারে হতাশাবাদ বেড়েছে, যা এই দরপতনের প্রতিফলন।
সোমবারের ডেটায় ইউরোজোনের Retail Sales এবং US Consumer Credit প্রধান আকর্ষণ হলেও, 9 এপ্রিলের সময়সীমার আগে US শুল্ক-সংক্রান্ত হালনাগাদের দিকেই সবার নজর। ট্রাম্প প্রশাসন অপ্রত্যাশিতভাবে অবস্থান নরম করলে রিস্ক-অন র্যালি শুরু হতে পারে—যা সোনা ও US ডলারকে চাঙ্গা করবে, আর JPY ও CHF-এর মতো নিরাপদ আশ্রয়ের মুদ্রার ওপর চাপ ফেলবে।
চলমান US-চীন উত্তেজনার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলারের মুদ্রাজোড়াগুলো দিকহীন থাকতে পারে। দুর্বল চাহিদা এবং সরবরাহ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কারণে অপরিশোধিত তেলের দরেও চাপ রয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর মাসিক লোকসান কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম, তবে শেয়ারবাজারে তীব্র পুনরুদ্ধার হতে পারে।
সামনে এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য, FOMC-এর কার্যবিবরণী এবং RBNZ-এর সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!